Ticker

6/recent/ticker-posts

কেন পড়বেন পঞ্জিকা: ইতিহাস ও বিবর্তন?


পঞ্জিকা: ইতিহাস ও বিবর্তন 

পঞ্চঞ্জনার পঞ্জিকা

সম্পাদনা

অর্জুনদেব সেনশর্মা 

অনিল আচার্য

কেন পড়বেন?


পঞ্জিকা ভারতীয় সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর তাছাড়া প্রায় সবারই জানবার কথা যে, মূলত হিন্দু ক্যালেন্ডারে, আর তার গণনাংশ ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার সূক্ষ্ম গণনাংশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পঞ্জিকা ও তার বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যে হিন্দু সংস্কৃতির প্রায় সমস্ত দিক রক্ষিত রয়েছে। শুধুমাত্র ফলিত জ্যোতিষের জন্য নয়, নিত্য-নৈমিত্তিক ও অন্য যে-কোনো ক্ষেত্রেই পঞ্জিকার পাঁচটা অঙ্গ এখানে থাকতে হয়। কেবল যে হিন্দুধর্মের মধ্যেই পঞ্জিকা আবদ্ধ হয়ে রয়েছে তাতো নয়। পৃথিবীর সব ধর্মের মানুষ কোনো না কোনো ভাবে পঞ্জিকা ব্যবহার করে দৈনিক জীবনযাপন করে। তাই সে বিষয়ে কিছু জ্ঞানগম্যি থাকা বাঙালির আবশ্যক ইত্যাদি বিবেচনায় প্রভূত পরিশ্রম এবং গবেষণার ফলে অনুষ্টুপ থেকে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হল। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র নির্মাণে এই প্রকাশনাটি সর্বদাই যে চেষ্টা করে পঞ্জিকা: ইতিহাস ও বিবর্তন/পঞ্চজনার পঞ্জিকা তারই ফলশ্রুতি।

প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৩

অনুষ্টুপ প্রকাশ

মূল্য ৫০০ টাকা

Panjika: Itihas O Bibartan: Panchajanar Panjika A Collection of Writings, Reprints and Paintings Relating to Panjika.

Edited by: Arjundeb Sensarma & Anil Acharya



এই বীটী থেকে আসুন আমার পছন্দের একটি প্রবন্ধ পড়া যাক।

বঙ্গাব্দ প্রসঙ্গে

নিতাই জানা

যে-কোনো অব্দ প্রচলিত হওয়ার পেছনে আমরা খুঁজে পাই একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার উপস্থিতি। এই ঐতিহাসিক ঘটনা বলা বাহুল্য, স্মৃতিলাঞ্ছিত অর্থাৎ অতীতের উজ্জ্বল মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চাওয়া। যিশুর জন্মদিনটিকে স্মরণীয় রাখতে চেয়ে একদা পাদরি ডায়নিসিয়স একসিওয়স প্রচলন করেন ক্রিশ্চান এরা বা খ্রিস্টাব্দ। তেমনি শকাব্দ প্রসঙ্গে অলবিরুনি রচিত কিতাব অল হিন্দ গ্রন্থ থেকে জানতে পারি, এক শক রাজার অত্যাচার থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে মুলতান ও লোনি দুর্গের মাঝামাঝি করুর (Karur) যুদ্ধে শক রাজাকে হত্যা করেন বিক্রমাদিত্য। অত্যাচার থেকে মুক্তির বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় রাখতে প্রজাসাধারণ ঐদিন থেকে গণনা করেন শকাব্দ। এই শকাব্দ প্রসঙ্গে জিন প্রভসুরি রচিত কল্পপ্রদীপ জানায় ভিন্ন কথা। প্রতিষ্ঠানপুর-নিবাসী এক বিদেশি ব্রাহ্মণের বিধবা ভগিনীর পুত্র শালিবাহন উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমকে পরাজিত করে ঘটনাটিকে সবার স্মরণে রাখতে প্রচার করেন শকাব্দ বা শক সংবৎ। দ্বাপর যুগের শেষ ঘটনা শ্রীকৃষ্ণর মৃত্যু। সেই মৃত্যু বা তিরোধান ঘটনাটি স্মরণীয় হয়ে আছে কল্যব্দ বা কলিযুগ সংবৎ প্রবর্তনায়। অনুরূপ বুদ্ধনির্বাণ অব্দ কিংবা বীরনির্বাণ সংবৎ। এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ আগমনের পূর্বে প্রচলিত, প্রধানতম তেত্রিশটি সংবৎ বা সনগুলি বিশেষ কোনো স্মৃতিচিহ্ন। অর্থাৎ যুদ্ধ জয় এবং সিংহাসন আরোহণ কিংবা বিশেষ কোনো ব্যক্তির তিরোধান অথবা অতি প্রয়োজনে ঘোষিত রাজাজ্ঞা। আবার জ্যোতিষ কর্তৃক দিন-মাস-বৎসর, গ্রহ-নক্ষত্র, রাশি-তিথি-লগ্ন ইত্যাদি গণনার প্রয়োজনে গড়ে উঠত বিশেষ কোনো সংবৎ।


দুই


সেদিনের বৃহৎ বঙ্গে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সংবৎ প্রচলিত হওয়ার পেছনে বিশেষ কোনো ঘটনা ছিল কিনা আমরা জানি না। কিন্তু বঙ্গাব্দ আজও প্রচলিত একটি সৌর নিয়ন্ত্রিত চান্দ্রবৎসর বা সন। খ্রিস্টাব্দর মতো ৩৬৫ দিনের বৎসর। পয়লা বৈশাখ বৎসর সূচনা দিবস। কিন্তু যেহেতু চান্দ্র তাই তিথি লগ্ন করণ ইত্যাদি আর নিয়ে দিবসগুলির যাওয়া-আসা। বাংলা পঞ্জিকায় তাই থাকে মলমাস অধিমাস ক্ষয়মাসের উল্লেখ ৷ আর সংক্রান্তির পর দিবস থেকে মাসগুলির সূচনা। বারোটি মাস যথাক্রমে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় শ্রাবণ ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক অগ্রহায়ণ পৌষ মাঘ ফাল্গুন চৈত্র। এবং এই মাসগুলি শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষে বিভক্ত।

বর্তমান ২০২১ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দর বয়স ১৪২৭। অর্থাৎ ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দের সূচনা ঘটে। এই সূচনা সনটির প্রতি আলোকপাতের কারণ, অনেকেই মনে করেন শশাঙ্ক তখন গৌড়ের রাজা। এবং তিনিই বঙ্গাব্দর প্রবর্তক। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার লেখেন: ‘৬০৬ অব্দের পূর্বে শশাঙ্ক একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন।' আসলে ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে থানেশ্বরের সিংহাসনে আরোহণ করেন হর্ষবর্ধন। এই সিংহাসন প্রাপ্তির পূর্বে শশাঙ্কর হাতে নিহত হয়েছিলেন হর্ষ অগ্রজ রাজ্যবর্ধন। তাই অনেকের অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কই ছিলেন বঙ্গাব্দর প্রবর্তক। মহারাজ শশাঙ্ক গৌড়ের সিংহাসনে ছিলেন, একথা সবাই সত্য বলেই জানে ৷ কিন্তু তিনি বঙ্গাব্দের প্রবর্তক এমন কোনো মুদ্রা বা লেখ অথবা পুঁথি আজও পাওয়া যায়নি। তাঁর নিজের অথবা সমকালীন রোটাসগড় সিলমোহর, গঞ্জাম সামন্তরাজ দ্বিতীয় মাধববর্মার তাম্রশাসন, ভাস্করবর্মার নিধনপুর শাসন, হর্ষবর্ধন-এর বাঁশখেরা ও মধুবন তাম্রশাসন, বাণভট্ট রচিত হর্ষচরিত, হিউ-এন সাঙ লিখিত সি-উ-কি গ্রন্থ, আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প নামক বৌদ্ধগ্রন্থ অথবা অনেক পরে আবিষ্কৃত দুবী শাসন, মেদিনীপুর তাম্রশাসন, এগরা তালপত্র ইতাদিতে বঙ্গাব্দ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নেই। বরং এরকম বয়ান সর্বত্র পাওয়া গেছে: শশাঙ্কর রাজত্বের অষ্টম বা নবম বা দ্বাদশ বৎসরে এই তাম্রশাসন প্রদত্ত হল। এই লিখনগুলি পাঠ করে দীনেশচন্দ্র সরকার লেখেন: ‘প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে কোনও অব্দ বা সালের ব্যবহার সুপ্রচলিত ছিল না। তখন রাজগণের রাজ্যসংবৎসরই দলিলপত্রের তারিখ হিসাবে ব্যবহৃত হত।'

হর্ষবর্ধন-এর সমকালীন রাজা শশাঙ্ক। ঐসময় ভারতবর্ষে আসেন চৈনিক পরিব্রাজক হিউ-এন সাঙ। ভারতবর্ষ ভ্রমণকালে মগধেই সব থেকে বেশিদিন ছিলেন তিনি। গয়ায় বোধিবৃক্ষ দর্শনকালে ভিক্ষুদের বর্ষা উদ্যাপন (Wass) সম্পর্কে কিছু কথা বলেন, তাতে ঐ সময়ের ভারতবর্ষের বর্ষগণনা প্রসঙ্গটি থেকে গেছে: ‘The priests of India, according to the holy instruction of Buddha, on the first day of the first half of the month Sravana enters on Wass... Hence it is in some places they enter on Wass on the sixteenth day of the fourth month.' তাঁর দীর্ঘ বর্ণনায় আরও অনেক প্রমাণ আছে পরোক্ষভাবে, যেখানে আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, পুরোনো ভারতবর্ষে বৈশাখ ছিল বর্ষ সূচনার প্রথম মাস। তিনি লিখেছেন মাসগুলির নাম নক্ষত্রের নামানুসারে রচিত এবং পুরোনোদিন থেকেই (From ancient days) নিয়মগুলি চলে আসছে, যদিও অনেক different school বর্তমান। অবাক কথা, এই প্রসঙ্গে তিনি একবারও শশাঙ্ক কিংবা বঙ্গাব্দর কথা বলেন না।

গজনির সুলতান মামুদ যখন ভারত আক্রমণ করেন, সেই সময় এসেছিলেন এক বিদেশি পর্যটক, পণ্ডিত অলবিরুনি। তাঁর রচিত কিতাব অল হিন্দ গ্রন্থে একাদশ শতকের ভারতবর্ষীয় হিন্দুদর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞানচিন্তা, আইন-ভাবনা, সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মচর্চা, পূজা-পার্বণাদি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এই গ্রন্থের ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়ে সেই সময়ের ভারতবর্ষে চলিত সংবৎগুলির একটি তালিকা পাওয়া যায়: ১. শ্রীহর্ষাব্দ ২. বিক্রমাব্দ ৩. শককাল বা শকাব্দ ৪. গুপ্তকাল বা গুপ্তাব্দ ৫. খণ্ডখাদ্যক অব্দ ৬. বরাহমিহির-এর পঞ্চসিদ্ধান্তিকা অব্দ ৭. করণসর অব্দ ৮. করণ তিলক অব্দ। প্রথম চার অব্দ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করলেও পরের চার অব্দ নিয়ে তিনি কিছু লেখেন না আমরা জানি, করণসর বা করণতিলক বরাহমিহির-এর পঞ্জিকায় ব্যবহৃত হওয়ার কারণে পরবর্তীকালে আলাদা কোনো পঞ্জিকা বা চর্চা হয়তো রহিত ছিল। আর ব্রহ্মগুপ্ত রচিত খণ্ডখাদ্যক পঞ্জিকা পশ্চিম ভারতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। যেহেতু তার জন্মভূমি ছিল মুলতান অঞ্চল। বলা বাহুল্য, শশাঙ্ক বা বঙ্গাব্দ সম্পর্কে কোনো কথা না রইলেও বরাহমিহির-এর নাম দিয়েই তিনি পঞ্চসিদ্ধান্তিকা এরা বা সংবতের উল্লেখ রেখেছেন সাগ্রহে : 'the era of the canon Pancasiddhantika by Varahamihira'।

বঙ্গাব্দ সম্পর্কে আরও একটি মিথ ব্যাপক প্রচলিত। অনেকে বলেন মুঘল সম্রাট আকবর বঙ্গাব্দর প্রবর্তক। ভারতে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর রাজদরবারে ব্যবহৃত হয় হিজরি সন। এই হিজরি সন সম্পূর্ণ শুদ্ধ চান্দ্র বৎসর। সৌর বৎসরের তুলনায় ১১ দিবস কম। ৯৯২ হিজরি, ২ রবিউস্তানি বা রবিউল আখির তারিখে সিংহাসনে আরোহণ করেন আকবর। অর্থাৎ ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি। বর্তমান ২০২১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দ বিয়োগ দিলে পাওয়া যায় ৪৬৭। অর্থাৎ, আজ থেকে ৪৬৭ বছর আগে আকবর সিংহাসনে বসেন। আকবর যদি প্রবর্তক হন, তাহলে বঙ্গাব্দর বয়স হবে বা হওয়া উচিত ৪৬৭ বছর। দুঃখের বিষয়, বঙ্গাব্দর বয়স ১৪২৭। এবং এই সন গণনার কোনো অন্যথা নেই ৷

চরি আকবর রাজ্য শাসন করতে গিয়ে হিজরি সন নিয়ে বিপদে পড়েন। যেহেতু সৌর বৎসরের তুলনায় ১১ দিন কম, তাহলে ফসল উৎপাদনের কাল এই বৎসর গণনায় বার বার পরিবর্তিত হতে থাকবে। এবং নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব আদায় হবে না। তাই আকবর বাধ্য হয়ে ফসলি নামক একটি সন প্রবর্তন করেন। হিজরি ৯৭১ সনে অর্থাৎ ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে এই ফসলি সনের চলন ঘটে। কিন্তু এই ফসলি সনের গণনায় স্থান অনুযায়ী কিছু পার্থক্য আছে। পাঞ্জাব, সংযুক্ত প্রদেশ এবং সেদিনের বৃহৎবঙ্গে এর বর্ষ সূচনা ছিল আশ্বিন, কৃষ্ণা প্রতিপদ। কিন্তু শাহজাহান যখন দক্ষিণ ভারত জয় করেন অর্থাৎ ১৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে দক্ষিণে ফসলি সনের গণনা আরম্ভ হয়। তাই দক্ষিণের সঙ্গে উত্তর ভারতের ফসলি সনের পার্থক্য প্রায় সোয়া দুই বছর। মহারাষ্ট্রে গণনা করা হয় মৃগশিরা নক্ষত্রে সূর্যের উপস্থিত কালে। তৎকালীন তামিল দেশে এর সূচনা ছিল কর্কট সংক্রান্তি অর্থাৎ শ্রাবণ মাসের প্রারম্ভ দিনে। আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে এ সব তথ্য থেকে গেছে।

ভারতবর্ষে প্রচলিত সমস্ত ধর্মগুলির সমন্বয় চেয়েছিলেন আকবর। তাই তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি ধর্ম প্রবর্তন করেন দীন-ই-ইলাহি। দীন-ই-ইলাহি ধর্মের একটি অঙ্গ হয়ে ওঠে ইলাহি সনের প্রতিষ্ঠা বা প্রবর্তন। ইরানের সুলতান মেলিক সাহ ১০৭৯ খ্রিস্টাব্দে প্রচলন করেন জেলালি সোলার ক্যালেন্ডার। এই সোলার ক্যালেন্ডার ভারতবর্ষে ইলাহি সন নামে প্রচারিত হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে। এই সনের বৎসর গণনা ছিল সৌরকেন্দ্রিক। জেলালি ক্যালেন্ডারে মাসগুলি ৩০ দিবস নিয়ে গঠিত। শেষের মাসটি ছিল ৩৫ দিবসের। তাছাড়া ১২০ বছর পরে একটি অধিক মাস যোগ করা হত। এই মাসের নাম ছিল কবিসা। কিন্তু আকবর প্রবর্তিত ইলাহি সনে কবিসা ছিল না। বঙ্গাব্দর মাসগুলির মতো ২৯/ ৩০/৩১/৩২ দিনের বিভিন্ন মাস তৈরি করেন আকবর। বৎসর ৩৬৫ দিনের হলেও প্রতি চতুর্থ বৎসরে ১ দিন বাড়িয়ে নেওয়া হত শেষ মাসটিতে। এ

ফসলি সন ছিল বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম। সুচনা দিবসের ঐক্য ছিল না। আর উগ্র ধর্মান্ধতার কারণে ধর্মনিরপেক্ষ দীন-ই-ইলাহিও আকবর-এর মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ লোপ পায়। কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত ছিল তাদের চিরাচরিত সনচর্চা। মেঘনাদ সাহা ‘India's calendar confusions' নামক প্রবন্ধে একথা লিখেছেন: ‘After a few decades, it fell into disuse, but it gave rise to number of hybrids like the Bengali san and the to number of hybrid Faslieras which are still current in parts of India'। বলাবাহুল্য, রাজদরবারে যখন ইলাহি সন তখন মুসলমান জনসাধারণ তাদের প্রাত্যহিক নিয়ম কিংবা উৎসব অনুষ্ঠান করতেন হিজরি সনের হিসেব অনুযায়ী। আর হিন্দু মানুষ কল্যব্দ, বিক্রমাব্দ বা শকাব্দ ইত্যাদির পাশাপাশি, বিশেষ করে বৃহৎবঙ্গে বঙ্গাব্দ অনুসরণে তিথি পালন, পূজা-পার্বণ এবং নির্ণয় করতেন সাংসারিক ও সামাজিক শুভাশুভ।

তিন

বঙ্গাব্দর সূচনা বা প্রারম্ভ ১ বৈশাখ। মেষ রাশিতে সূর্যের প্রবেশ ঘটে ঐদিন। রাশিচর্চা পৃথিবীর কোন দেশে প্রথম শুরু হয়েছিল তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। প্রাচীন ভারতবর্ষে রাশির উপর প্রথম গুরুত্ব আরোপ করেন আর্যভট্ট। তাকে বলা হয় কুসুমপুরের মহাজ্যোতিষী। তার সিদ্ধান্তমূলক গ্রন্থ আর্যভট্টীয় (খ্রি: ৪৯৯)-র মাত্র চারটি অধ্যায়। দশগীতিকা, গণিতপাদ, কালক্রিয়া ও গোলক। দশগীতিকার তৃতীয় ও চতুর্থ সিদ্ধান্তশ্লোকে তিনি ঘুর্ণন সংখ্যা এবং শূন্যবিন্দু অর্থাৎ সূচনার কথা বলেন। বর্তমানে, কেবলমাত্র চতুর্থ সিদ্ধান্তশ্লোকটি ঐ মহাগ্রন্থ থেকে চয়ন করা যায়:

চন্দ্রোচ্চজুধি, বুধ

সুগুশিথুন, ভৃগু জযবিখুছ, শোয়ার্কাঃ।

বুফিনচ পাতবিলোমা দেলো। 

আর টি টি ৩০ বুধাহ্নয়জাকোয়াচ্চ লঙ্কায়াম ৷৷

গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন পণ্ডিত কৃপাশঙ্কর শুক্লা। তার অনুবাদের সামান্য অংশ তুলে দেওয়া যায়: ‘These revolu tions commenced at the beginning of the sign Aries on Wednesday at sunrise at Lanka'। এই যুগ, বলাবাহুল্য, কলিযুগ। এখানেই শেষ নয়, গোলক অধ্যয়ের প্রথম শ্লোকে রবিপথকে অবলম্বন করে উল্লেখ করেন দ্বাদশ রাশির অবস্থান ও অয়ন চলন: 

মেষাদেঃ কন্যান্তং সমুদগপমণ্ডলাধমপয়াতম।

In noiauty তৌল্যাদেমীনান্তং শেষার্ধং দক্ষিণেনৈব ৷৷

কৃপাশঙ্করবাবুর অনুবাদের অর্থ এরকম: মেষ থেকে শুরু করে কন্যা অবধি রবিপথের উত্তরায়ণ এবং সপ্তম রাশি তুলা থেকে শুরু হয়ে শেষ মীন রাশিতে একে বলা হয়, দক্ষিণায়ন।

সেদিনের মানুষের কাছে সৌরকেন্দ্রিক মাস ও বৎসর গণনা অত্যন্ত জরুরি ছিল। যেহেতু সূর্য ঋতুগুলির নিয়ন্ত্রক। ঋতু অনুযায়ী গড়ে ওঠে কৃষি চাষ ছাড়া সাধারণ নুষের বেঁচে থাকা মুশকিল। তাই এখানে রাশি ও অয়নচলন নিয়ে সামান্য আলোচনার অবকাশ থাকে।

খালি চোখে আমরা দেখি সূর্যের আকাশ পরিক্রমা। এই চলন কিন্তু সরল রেখা ধরে ঘটে না। সূর্য দক্ষিণদিক ঘেঁষে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে পৌঁছোনোর পর আবার যখন উত্তরমুখী হয়, তখন দেখা যায় সূর্য চলছে উত্তরদিক ঘেঁষে। এই উত্তর ও দক্ষিণের নির্দিষ্ট স্থান দুটির মধ্যস্থল বৃত্তাকার ১৬ ডিগ্রি পরিমিত। বলয়াকৃতি এই স্থানকে রাশি দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। প্রাচীন ভারতের মানুষ এর নাম রাখেন বৈশ্বানর পথ বা রবিমার্গ। বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞানে এর নাম ক্রান্তিবৃত্ত। এই ক্রান্তিবৃত্তকে প্রাচীনকাল থেকে বারো ভাগে ভাগ করা হয়। বারোটি ভাগ অর্থাৎ বারো রাশি। সূর্য প্রতি মাসে একটি রাশিকে অতিক্রম করে। বছরে বারোটি রাশিকে অতিক্রম করতে সময় লাগে ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা ৯ মিনিট ৯.৫ সেকেন্ড। বারো রাশি অর্থাৎ বারোটি তারকামণ্ডল। সুদুর প্রাচীনকাল থেকে মণ্ডলগুলিকে চিহ্নিত করা হয় পার্থিব কোনও জীব বা কোনও বস্তুর নামে। বারো মণ্ডলের নাম যথাক্রমে, মেষ বৃষ মিথুন কৰ্কট সিংহ কন্যা তুলা বৃশ্চিক ধনু মকর কুম্ভ মীন। আকাশের বুকে মণ্ডলের তারকাগুলি কাল্পনিক রেখায় যুক্ত হয়ে এক-একটি জীব বা বস্তুর রূপ ফুটিয়ে তোলে। আর প্রতিটি মণ্ডলের উজ্জ্বল নক্ষত্রটির নামে বারোটি মাসের নামও ঠিক হয়। যেমন বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদি।

PH ক্রান্তিবৃত্তে সূর্য কখনও উত্তর, কখনও দক্ষিণ ঘেঁষে চলে— খালি চোখে এই দৃশ্য সবাই দেখে। তাই এখানে আসে অয়ন প্রসঙ্গ। আহ্নিক আর বার্ষিক গতিতে পৃথিবীর চলন সীমাবদ্ধ নয়। তার আরও একটা চলন বর্তমান। পৃথিবীর অক্ষ নিজের কক্ষের উপর লম্ব নয়। তাই ২৫৮০০ বছরে লম্বের চারদিকে একবার আবর্তন করে পৃথিবীর অক্ষ। পরিণামে, সূর্যের তুলনায় ক্রান্তিবৃত্ত ও বিষুবরেখার ছেদবিন্দুও ২৫৮০০ বছরে একবার ৩৬০ ডিগ্রি আবর্তন করে থাকে। একেই বলে অয়ন বা মেরুগতি। সুদীর্ঘ বছর ধরে এই যে চলন, এখানে পৃথিবীর লক্ষ্যও অস্থির হতে বাধ্য। যেমন আজকের পৃথিবীর চলন ধ্রুবতারা অভিমুখে। কিন্তু একটা সময় তা থাকবে না। ড্রেকো মণ্ডলের শেষ তারা আলফা। এই তারাটি পাঁচহাজার বছর পূর্বে আমাদের ধ্রুবতারা ছিল। মেরুবিন্দু ধীর গতিতে সরে বর্তমানে শিশুমার মণ্ডলের সর্বোজ্জ্বল তারার কাছে এসেছে। আর এই তারাটি বর্তমান ধ্রুবতারা। আবার পাঁচ হাজার বছর পরে মেরুবিন্দু সিফিউস মণ্ডলের উজ্জ্বলতম তারাটির কাছে যাবে। সেই তারা তখন হবে ধ্রুবতারা। FR. PISE FI স্বাভাবিক কারণে এর প্রভাব পড়ে পৃথিবীর ওপর। চার-পাঁচ হাজার বছরের মধ্যে ঋতু ও নিসর্গের পরিবর্তন ঘটে যাবে। বর্ষা ঠিক সময়ে আসবে না। কৃষির সময় বদলে যাবে। তখন পঞ্জিকা সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এর প্রমাণ থেকে গেছে। প্রাচীন ভারতবর্ষে তাই কখনও বৎসর শুরু হয় মার্গশীর্ষে, কখনও-বা ফাল্গুন পূর্ণিমায়। আবার কখনও মধুমাস অর্থাৎ চৈত্র।

বেদাঙ্গ জ্যোতিষ রচনাকালে অয়ন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন মহর্ষি লগধ ৷ কিন্তু রাশির মূল্য সম্পর্কে প্রথম সচেতক আর্যভট্ট। আর্যভট্টর এই মেষ রাশি-সংক্রান্ত যুগ গণনা সমর্থন করেন পরবর্তীকালের বরাহমিহির। যদিও তিনি আর্যভট্টর অন্যান্য সিদ্ধান্ত যেমন— পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে পরিভ্রমণশীল, সুর্যের আলোয় চন্দ্র আলোকিত ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্র-বিরোধী মতবাদগুলি কখনোই মেনে নেননি।

পূর্বকালে প্রচারিত পৌলিশসিদ্ধান্ত, রোমকসিদ্ধান্ত, পৈতামহসিদ্ধান্ত, বশিষ্ঠসিদ্ধান্ত ও সূর্যসিদ্ধান্ত নামক পাঁচটি গ্রন্থের গ্রহণ-বর্জনে রচিত হয় বরাহমিহির-এর পঞ্চসিদ্ধান্তিকা (খ্রি.৫৫০)। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি ও গ্রহণ নিয়ে রচিত এই গ্রন্থ ছিল সেকালের পঞ্জিকা প্রণয়নের অগ্রদূত বা বীজক। এরই উল্লেখ করেছেন পণ্ডিত অলবিরুনি। বরাহমিহির-এর পূর্বে মধু অর্থাৎ চৈত্র মাস থেকে বর্ষগণনা ছিল। কিন্তু তার পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে ঋতুগুলির পরিবর্তন। মাধব অর্থাৎ বৈশাখ আর বসন্তঋতুর মাস নয়। জ্যৈষ্ঠ থেকে বর্ষা সরে গেছে আষাঢ়ে। গ্রীষ্মঋতুর মাস হয়ে উঠেছে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ। এই জ্যৈষ্ঠ মাসে বীজবপন হবে আর হালকা বৃষ্টিতে ঘটবে তার অঙ্কুরোদ্‌গম। আষাঢ়ের প্রথম দিবসের জলভারানত মেঘের ছবি মেঘদূত কাব্যে ধরে রেখেছেন কালিদাস। হয়তো কৃষিই ছিল পঞ্চসিদ্ধান্তিকা রচনার অন্যতম কারণ গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপ্রকৃতি দেখে তিনি প্রবর্তন করেছিলেন নতুন পঞ্জিকা। মেষ রাশিতে সূর্যের প্রবেশ এবং বৈশাখে বর্ষ সূচনা।

এই সংশোধনে তার আরও একটি গ্রন্থ অত্যন্ত পরি পরব অত্যন্ত পরিপূরক। নাম, বৃহৎসংহিতা৷ ১০৭ অধ্যায়ের একটি বিশাল গ্রন্থ। এই অধ্যায়গুলিকে আমরা দুইভাগে বিভক্ত করতে পারি। এক: প্রাকৃতিক— এর সঙ্গে গ্রহ-নক্ষত্রের যোগ নেই। এখানে মেঘ, বৃষ্টি, কৃষি প্রধান হয়ে উঠছে। পরিণাম হিসেবে শস্য হয়ে গেল সপ্রাণ একটি জাতক। দুই: গ্রহ-নক্ষত্র যোগের ফলাফল ও বিচার। এই বিভাগের জন্যই বরাহমিহির আজও অম্লান। এই বিভাগটির প্রতিপত্তির কারণ অনিশ্চিত। মানুষের সংগ্রাম। এই সংগ্রামে জ্যোতিষ বা গণক সম্প্রদায় মানুষ অর্থাৎ জাতকের ভাগ্য পরিবর্তনের কিছু পরামর্শ রাখেন। যদিও এর সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, লগ্ন, রাশিসুত্রে জাতকের ভূত-ভবিষ্যৎ ও বর্তমান গণিতের সাহায্যে বিচার করে থাকেন জ্যোতিষ বা গণক সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায় গণিতে আস্থা রেখে গণিতের ফলাফলকে মিশিয়ে দেন ধর্মশাস্ত্রের আদেশ-উপদেশে। কেমন হবেন এই জ্যোতিষ বা গণক সম্প্রদায়। বৃহৎসংহিতা-র দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিস্তৃত বর্ণনা রেখেছেন বরাহমিহির।

বরাহমিহিরের প্রভাব ছিল সুদুরপ্রসারী। এই জ্যোতিষ বা গণক সম্প্রদায় নবজাতকের ভবিষ্যৎ গণনা করে ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে তৈরি করে দিলেন ঠিকুজি বা কোষ্ঠী। নবজাতকের জন্ম থেকে শেষ বয়স অবধি শুভাশুভ নির্ণয়। এই নির্ণয়ে বর্ষগণনার মেষ রাশি ও বৈশাখ মাস হয়ে উঠল অবশ্যমান্য। লোকসমাজে এঁদের ব্যাপক প্রভাবের কথা বারবার উল্লেখ করেন অলবিরুনি। বরাহমিহির যে ধীরে ধীরে মিথ হয়ে উঠছেন তার প্রমাণ থেকে গেছে খনা ও মিহির-এর গল্পকথায়। লোকসমাজে প্রচলিত অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক একটি আখ্যান। আর ঘরে ঘরে প্রচলিত খনার বচনগুলিকে বৃহৎসংহিতা-পড়া যে-কোনো ব্যক্তি মনে করবেন, খনা ছদ্মনামে এগুলি রচনা করেছেন বরাহমিহির। এই জ্যোতিষ বা গণক সম্প্রদায় নিজেদের জীবিকার প্রয়োজনে একটা পঞ্জিকা হাতে নিয়ে দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করেন আজও। ব্যবসা-বাণিজ্য, গৃহনির্মাণ, বিবাহ, যাত্রাকালের সময় নির্ধারণ, ঝড়-বৃষ্টি-দুর্ভিক্ষ এবং নবজাতকের ভাগ্য গণনা করে থাকেন এঁরাই। প্রখর বিজ্ঞানবুদ্ধির দিনেও এঁদের কদর সমাজে বিন্দুমাত্র কমেনি। তাই বঙ্গাব্দ-পঞ্জিকা প্রণয়নে মেষ রাশিতে সূর্যের প্রবেশ ও বর্ষসূচনায় বৈশাখ মাস নিরূপণে থেকে গেছে বরাহমিহির-এর দীর্ঘ এ-এর দীর্ঘ ছায়া।

চার

৫২৭ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক সময় রোম নগরের এক পাদরি ডায়নিসিয়স একসিগুয়স ক্রিশ্চান এরা অর্থাৎ খ্রিস্ট অব্দ প্রচলন করেন। তার হাতে তথ্য হিসেবে ছিল রোমনগরীর প্রতিষ্ঠাকাল। ১৯৪ অলিম্পিয়ডের চতুর্থ বর্ষে ঘটে রোমের প্রতিষ্ঠা। এই প্রতিষ্ঠা থেকে ৭৯৫ বছরে জন্মেছিলেন যিশু খ্রিস্ট। এই ব্যক্তি-বিশেষের জন্ম থেকে গণনা হয়ে আসছে ক্রিশ্চান এরা অর্থাৎ খ্রিস্টাব্দ। এ প্রসঙ্গে আরও একটি ঘটনা আছে। তাঁর জন্মের সময় আকাশে উপস্থিত ছিল একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। জর্মন পণ্ডিত জোহান কেপলার মনে করেন, ঐসময় বৃহস্পতি ও শনি একত্রিত হয়েছিল মীন রাশিতে। সে সময় যাঁরা আকাশে এ দৃশ্য দেখেন, তারা একটি নক্ষত্রকেই অবলোকন করেন। কেপলার-কথিত এই তথ্য পেয়ে অনেকেই মনে করেন, খ্রিস্টাব্দ গণনা ভুল। যিশুর জন্ম প্রচলিত খ্রিস্টাব্দ সূচনার আরও সাত/আট বছর পূর্বে।

এমন খ্রিস্টাব্দ বিভ্রান্তির দিকে তাকিয়ে বঙ্গাব্দ সুচনার খ্রিস্ট অব্দ ও বরাহমিহির-এর প্রয়াণ কালের প্রসঙ্গ আসে। বরাহমিহির-গবেষক ড. ভাউদাজি এবং জোহান হেনরিক কাসপার কার্ণ বরাহমিহির-এর প্রয়াণকাল হিসেবে চিহ্নিত করেন ৫৮৭ খ্রিস্টাব্দ। পৃথিবীর অন্যান্য পণ্ডিতগণও এই ৫৮৭ খ্রিস্টাব্দকে মেনে নিয়েছেন। তাই যদি কেউ অনুমান করেন, খ্রিস্টাব্দ গণনার মতো মৃত্যুর অনেক বছর পরে ঘোষিত হয়েছিল বঙ্গাব্দ এবং এই বঙ্গাব্দ গণনার মধ্যে থেকে গেছে মেষ রাশিতে সূর্যের প্রবেশের মতো পঞ্জিকা প্রণয়নকারী জ্যোতিষগুরু বরাহমিহির-এর স্মৃতি, তাহলে অন্যায় অনুমান হয় না। তাছাড়া, আমাদের ভারতবর্ষে তিরোধান বা নির্বাণ থেকে রচিত হয়েছে কয়েকটি অব্দ। কল্যব্দ, বীরনির্বাণ অব্দ, বুদ্ধনির্বাণ অব্দ। ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দের সূচনা আর বরাহমিহির-এর মৃত্যু ৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে। হয়তো ৭০০-৮০০ বছর পরে কোনো এক জ্যোতিষী এই সময়টি নির্ধারণ করেছিলেন।

রাজা যায় রাজা আসে। আর রচিত বা ঘোষিত হয় নতুন সংবৎ। কিন্তু পঞ্জিকা রচিত হয় নিজের নিয়মে। প্রাকৃতজন এই নিয়মকে মান্য করেন। এই নিয়ম তাঁকে শুনিয়ে গেছেন বর্ষ শুরুর দিনে কোনো এক জ্যোতিষী। দুর্বিপাকে শান্তি স্বস্ত্যয়নের জন্য সেই জ্যোতিষীর বিধান গ্রহণ করেন গৃহস্থ। রাজার সংবৎ থাকে রাজসভায়, শিক্ষিত নাগরিকদের চর্চায়। এর প্রমাণ নিকট অতীতের মুঘল দরবার। জ্যোতিষীর পঞ্জিকা উগ্রপন্থীর গোপন অস্ত্রের মতো। জ্যোতিষ ছড়িয়ে গেছে জনসাধারণের চেতনা ও অবচেতনায় ৷

উপসংহার

মেষ রাশিতে সূর্যের প্রবেশ এবং বর্ষসূচনা নিয়ে বাঙালির বঙ্গাব্দ। অনুরূপ ঘটনা ঘটে তামিলনাড়ু এবং কেরলে। আমাদের বৈশাখ তামিল ভাষায় Puthandu আর মালয়ালমে Medam। পাঞ্জাবেও বর্ষসূচনা বৈশাখ মাসে। আরও বিস্মিত হতে হয়, আরাকান কম্বোডিয়া লাওস থাইল্যান্ড নেপালদেশেও মেশ রাশিতে সূর্যের প্রবেশ দিবসেই নববর্ষের সূচনা। শশাঙ্ক বা আকবর এই দুর দেশগুলি শাসন করে ছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর রবীন্দ্র-সঙ্গমে দ্বীপময় ভারত ও শ্যাম-দেশ নামক মহাগ্রন্থটি থেকে জানা যায়, ধর্মীয় উৎসব এবং অনুষ্ঠান ঐ দেশগুলিতে পালিত হয় ভারতীয় পঞ্জিকার তিথি অনুযায়ী। বরাহমিহির-এর জ্যোতিষ সম্প্রদায় সমুদ্র পেরিয়ে জীবিকার তাড়নায় উপগত হয়েছিলেন ঐসব দুরের দেশে এবং ভাগ্যগণনা, শুভাশুভ নির্ণয় ঐ দেশের মানুষদের মধ্যে আজও বর্তমান। তিথি আর সময় বা মুহূর্ত বিচার পঞ্জিকা ব্যতিরেকে অসম্ভব। আরও অসম্ভব পঞ্চসিদ্ধান্তিকাও বৃহৎসংহিতাকে বাদ দিয়ে ভারতীয় জ্যোতিষচর্চা। বর্তমানে প্রচলিত পঞ্জিকাও বরাহমিহির অনুসরণে রচিত। 


সহায়ক পঞ্জী

  • Beal, Samuel 1884: Si-yu-ki, Budhist Records of the Western World, Vol. 2, London: Trubner & Co. Ludgate Hill Burgess.

  • Rev. Ebenezr 1860: The Surya Siddhanta (Ed. Phanindralal Gangoly, Introduction: Probodhchandra Sengupta), MLBD, Delhi.

  • Clark, W.E. 1930: The Aryabhatya of Arybhata, The University of Chicago Press, Chicago, Illinois.

  • Davids, T.W. Rhys and Oldenberg, Harman 1885: Vinaya Texts (Ed. Max Muller, Sacred Book of East, Vol. 13), M.L.B.D. Delhi.

  •  Jarrett, Colonel H.S. 1949: The Ain-I-Akbari, Vol. II, The Asiatic Society, Kolkata.

  • Kern, Johan Hendrik Caspar 2013: Brhat Samhita of Varaha Mihira (Tran. N. Chidambaram lyer, Ed. Dr. Shrikrishna Jugnu) Parimal Publication, Delhi. Sachau.

  • Edward C. 2002: Alberuni's India, Rupa Publication of India Pvt. Ltd. New Delhi.

  • Saha, M.N. 1953: India's Calendar Confusions, The Journal of the Royal Astronomical Society of Canada, Vol. XL, VII, May-June.

  • S. Sastry, T. S. Kuppanna 1984: Vedanga Jotisa, Bharatiya Vidya Bhavan, Bombay.

  • So. Shukla, Kripa Shankar 1976: Aryabhatya of Aryabhata, Indian National Science Academy. New Delhi.

  • Thackston, Wheeler M. 2017: The History of Akbar. Vol.- 3, Harvard University Press.

  • Thibaut, G. & Dvivedi Mahamahopadhyaya Sudhakara 1889: The Panchasiddhantika, E.J.L.azarus and Co. Benares,

  • ওঝা, গৌরীশঙ্কর হীরাচাঁদ ১৩৯৬; প্রাচীন ভারতীয় লিপিমালা (অনু: মনীন্দ্রচন্দ্ৰ সমাজদার) বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

  • চট্টোপাধ্যায় সুনীতিকুমার ১৯৬৪: রবীন্দ্র-সঙ্গমে দ্বীপময় ভারত ও শ্যামদেশ, প্রকাশ ভবন, কলকাতা।

  • দে, কামিনীকুমার ১৯৮২: তারামণ্ডল ও বিশ্বের বিশালতা, প. ব. রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা।

  • মজুমদার, রমেশচন্দ্র ১৯৮৮: বাংলাদেশের ইতিহাস (১ খণ্ড) জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যাণ্ড পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা। রায়, যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি ১৩৫৮: পূজা-পাৰ্বণ, 5. বিশ্বভারতী, কলকাতা কলকাতা।

  • সরকার, দীনেশচন্দ্র ২০০১, অশোকের বাণী, সাহিত্যলোক, কলকাতা, ২০০৯। শিলালেখ-তাম্রশাসনাদির প্রসঙ্গ, সাহিত্যলোক, কলকাতা।

  • সেন, সুকুমার ১৯৭৪, বঙ্গভূমিকা, ইস্টার্ন পাবলিশার্স, কলকাতা।

সূত্রঃ পঞ্জিকা : ইতিহাস ও বিবর্তন গ্রন্থ থেকে।

Post a Comment

0 Comments